গাছপালা

বাঁশ গাছ

বাঁশ গাছ Gramine পরিবারভূক্ত এক ধরনের বহু বর্ষজীব কাষ্ঠল ঘাস বিশেষ। অন্যান্য ঘাষ থেকে বাশের একটা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ব্যাহ্যিক গঠনাবলীর দিক থেকে বাঁশ গাছকে তিনটি অংশে ভাগ করা যায়। মাটির উপরে সরল, লম্বা এবং চোংগাকৃতি কাঠের ন্যায় শক্ত সবুজ অংশ (কালম) যা আমরা বিভিন্ন নির্মাণ কাজে ব্যবহার করে থাকি, মাটির নীচে স্তুল আনুভূমিক কাণ্ড (রাইজম) বা মুথা এবং মথার নীচরে গুচ্ছমূল । বৈজ্ঞানিকদের ধারণা, পৃথিবীতে প্রায় ১৫০০ প্রজাতির বাঁশ রয়েছে। তার মধ্যে চীন ও ভারতেই রয়েছে অধিক সংখ্যক প্রজাতি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে পর্বতের উপরে তুষার রেখা পর্যন্ত বিভিন্ন প্রজাতির বাঁশ প্রাকৃতিকভাবে জন্মাতে দেখা যায় । ইউরোপ মহাদেশ ছাড়া এশিয়া, আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার কোন কোন বনাঞ্চলে বিভিন্ন প্রজাতির বাঁশ প্রাকৃতিকভাবে জন্মে। উপকূলীয় বনাঞ্চল ছাড়া মোটামুটিভাবে সকল গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চল ও কোন কোন ক্ষেত্রে নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডলীয় অঞ্চলে বাঁশ জন্মে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব-এশিয়ার প্রায় প্রতিটি দেশে বিভিন্ন জাতের প্রচুর বাঁশ প্রাকৃতিকভাবে জন্মে এবং চাষ করা হয়ে থাকে।

প্রজাতিভেদে বাশ গাছের আকৃতি বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। মূথা বা রাইজমের দৈর্ঘ্য, গঠন, প্রকৃতি ও বৃদ্ধির প্রকার ভেদের জন্য মাটির উপরে বাশ ঝাড়ের গঠন প্রকৃতি সাধারণতঃ দু’ধরনের হয়। প্রথমতঃ স্বল্প দৈর্ঘ্যের পুরু ও মোটা মূথা অনেকগুলো বাঁশের কাছাকাছি জন্ম দিয়ে ঝাড় সৃষ্টি করে এবং দ্বিতীয়তঃ লম্বা, পাতলা ও সরু মূথা মাটির নীচে দূরে দূরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বাঁশের জন্ম দেয়। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে ঝাড়ের সৃষ্টি হয় না। আমাদের দেশের সকল প্রজাতির বাঁশঝাড় সৃষ্টি করে কিন্তু নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডলের যেমন: চীন ও জাপানের উত্তরাংশে অনেক প্রজাতির বাঁশ ঝাড় সৃষ্টি না করে আলাদা আলাদাভাবে গজিয়ে থাকে। আমাদের দেশের মুলি বাঁশ অনেকটা ফাক ফাকভাবে জন্মায়। কিছু প্রজাতির বাঁশ আছে যেগুলো লতার মতো অন্য গাছ ধরে উপরে উঠে । কোন কোন বাঁশের প্রজাতির কঞ্চির পর্বে একটি বা একত্রে তিনটি কাটা থাকে। এগুলো বাঁশকে আত্মরক্ষায় সহায়তা করে।

বনাঞ্চলের প্রধান বাঁশ প্রজাতি : বাংলাদেশ গ্রীষ্মমণ্ডলীর অঞ্চলে অবস্থিত। এদেশের মৌসুমী জলবায়ু ও মাটি বাঁশের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। দেশের উত্তর-পূর্বে সিলেট অঞ্চলে এবং দক্ষিণ পূর্বের চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে রয়েছে বিস্তর টিলা ও উঁচু পাহাড়। ময়মনসিংহের উত্তরেও কিছু কিছু টিলা রয়েছে। দেশের প্রধান বনাঞ্চলগুলো এই সমস্ত পাহাড়ী এলাকাতেই অবস্থিত। এ সমস্ত বনাঞ্চলে বাঁশ প্রাকৃতিকভাবে জন্মে থাকে। উপকূলীয় বনাঞ্চল ও সুন্দরবনে প্রাকৃতিকভাবে কোন বাঁশ জন্মে না। বাংলাদেশের বনাঞ্চলের প্রধান বাঁশ প্রজাতিগুলোর নাম ও ব্যবহারের তালিকা নীচে দেওয়া গেল।

গ্রামাঞ্চলের বাঁশের প্রজাতিগুলোর দেয়াল সাধারণতঃ পাতলা হয়ে তাকে এবং এক সেন্টিমিটারের বেশী পুরু হয় না। এই ধরনের বাঁশ ৪ থেকে ১৫ মিটারে মতো লম্বা এবং বেড় ২ থেকে ৬ সে. মি. পর্যন্ত হতে দেখা যায়। মুলি, মিতিংগা, ওরা, ডলু ও কালি বাঁশ এদেশের প্রধান বনজ বাঁশ প্রজাতি। বনের ভিতর এ সমস্ত প্রজাতির বাঁশ অধিকাংশ ক্ষেত্রে বড় বড় গাছের সাথে বা নীচে মিশ্রভাবে জন্মায়। তবে ময়মনসিংহের উত্তরে গারো পাহাড় অঞ্চলে, সিলেটের জুরি, রাজকান্দি, হারারগঞ্জ ও আদমপুর এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের কাসালং ও রাইখিয়ং, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবনসহ বেশ কয়েকটি বনাঞ্চলে মাঝেমধ্যে অবিমিশ্রভাবে বা এককভাবে কেবল মুলি বাঁশের বন দেখা যায়। কক্সবাজার হতে আরো দক্ষিণের বনাঞ্চলে মুলি বাঁশের তেমন একটা বিস্তৃতি দেখা যায় না। বিশিষ্ট বিজ্ঞানী গেম্বল ১৮৯৬ সনে তাঁর প্রণীত ” বাম্বুসা অব ব্রিটিশ ইন্ডিয়া” গ্রন্থের ১৯৯ পৃষ্ঠায় লিখেছেন যে, “প্রতি বৎসর চট্টগ্রামের বনাঞ্চল থেকে প্রচুর পরিমাণ মুলি বাঁশ সংগ্রহ করে বৃহত্তর বাংলায় চালান দেওয়া হতো। গাংগেয় ব-দ্বীপ অঞ্চলে প্রতি বছর ঘরবাড়ী নির্মাণের জন্য প্রায় ১৬ মিলিয়ন মুলি বাঁশের দরকার পড়তো”। এখনো প্রাপ্যতার দিক থেকে মুলিই বনাঞ্চলের প্রধান বাশ (৮০-৯০%) এবং দ্বিতীয় স্থান হিসাবে মিতিঙ্গা বাঁশের নাম করা যায়। কালি বাঁশ সাধারণতঃ বনের প্রান্তভাগে জন্মে। পেঁচা বাঁশ কেবল মাত্র সিলেটের পাহাড়িকা অঞ্চলের ছড়ার পাড়ে পাড়ে জন্মাতে দেখা যায়। কক্সবাজারের পানেরছড়া বনাঞ্চলে মিশ্রভাবে লতাবাশ জন্মে থাকে। বনাঞ্চলের ভেতরে ছড়ার পাড়ে বড় বড় গাছের ছায়ায় অপেক্ষাকৃত ভেজা জমিতে ডলু বাঁশ জন্মে থাকে। পেঁচা ও লতাবাশ তুলনামুলকভাবে অল্প পরিমাণে পাওয়া যায়। ব্যাপক হারে বনবিরানের ফলে ডলু, পেঁচা ও লতাবাশের আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় এই প্রজাতিগুলো বর্তমানে বিলুপ্তপ্রায় বাঁশ প্রজাতি হিসাবে গণ্য করা হয়।

গ্রামাঞ্চলের প্রধান বাশ প্রজাতি : আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলের প্রায় প্রত্যেক বাড়ীতেই কৃষকগণ বাঁশের চাষ করে থাকেন। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা অঞ্চলে বরিয়ালা (বাইজ্যা) বাঁশ এবং উত্তরবঙ্গের দিনাজপুর, রাজশাহী, রংপুর, সৈয়দপুর, বগুড়া ইত্যাদি স্থানে মাকনা ও বরুয়া বাঁশই বেশী দেখা যায়। সিলেট, ময়মনসিংহ ও ফরিদপুর অঞ্চলে উভয় জাতের বাঁশের বেশী করে চাষ করা হয়ে থাকে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন বাঁশের নাম ও তাদের প্রধান ব্যবহার নীচে দেওয়া গলে। মোটামুটিভাবে আমাদের দেশে গ্রামের বসতভিটাতে বরুয়া, বারিয়ালা, মাকলা ও তল্লা এই চারা জাতের বাঁশেরই বেশী চাষ হয়ে থাকে।

বাঁশের চাষ সামাজিক একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন কৌশল। বাংলাদেশে বাঁশের উৎপাদন ও ব্যবহার সার্বজনীন ভাবে প্রচলিত। বসতবাড়ী নির্মাণে দালানকোঠা নির্মাণের টানারূপে, কৃষিকাজ, আসবাবপত্র ,কাগজ তৈরী শিল্পে, সাঁকো, জ্বালানী, বাঁশ ছড়ি, কুলা ও কুটির শিল্পের কাজে বাঁশের ব্যবহার হয়ে থাকে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন বাঁশের বেশী করে চাষ করা হয়ে থাকে।

বর্তমানে বছরে প্রায় ১০ লক্ষ টন শুকনো বাঁশ বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর মধ্যে গ্রাম থেকে ৮ লক্ষ টন ও বনাঞ্চল থেকে ২ লক্ষ টন আসে। বাংলাদেশে অনেক পদ্ধতির বাঁশ আছে যেমন : মুলি, বরাক, মাকলা, জাই, বারিয়ালা ইত্যাদি। আমাদের দেশে বর্তমানে প্রায় ২৭ প্রজাতির বাঁশ আছে নিম্নে তাদের বিবরণ দেয়া হলো:

 

দেশীয় নাম বৈজ্ঞানিক নাম প্রাপ্তির স্থান প্রধান ব্যবহার
১। মুলি Melocanna baccifera Kurz. প্রধানতঃ বনাঞ্চল

 

প্রধান ব্যবহার বেড়া, তরজা, ছাদের আড়, আসবাবপত্র, মণ্ড, কাগজ ও রেয়ন, সদ্য গজানো কোড়ল (খাদ্য হিসাবে) ও ছাতার ডাঁট।
২। মিতিংগা Bambusa tulda প্রধানতঃ বনাঞ্চল বেড়া, তরজা, খুঁটি ও ছাউনি।
৩। ওরা, খাগ Dendrocalamus longispathus Kurz. প্রধানতঃ বনাঞ্চল

 

বেড়া, তরজা
৪। কালি (কালিশেরী, কালিমুড়ি, কালিয়া) Gigantochloa andananica

Widjaja

প্রধানতঃ বনাঞ্চল

 

বেড়া, তরজা, ছাতার ডাঁট ও বড়শি।
৫। উলু Neohouzeaua dullooa Camus. প্রধানতঃ বনাঞ্চল

 

বেড়া, তরজা, কুলা, চাটাই, চোংগা, পিঠা বানাতে ব্যবহার করা হয়।
৬। লতা

 

Melocalamus cornpactiflorus Benth প্রধানতঃ বনাঞ্চল

 

দড়ি বা বেতের ন্যায় ব্যবহার করা হয়।
৭। পেঁচা Dendrcalamus hamiltonii Nees প্রধানতঃ বনাঞ্চল

 

খুঁটি তরজা ও বেড়া
৮। তেলী বরুয়া । শিলবরুয়া, শীলবুড়ো (সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া); বালকু, বরাক (ময়মনসিং, কুমিল্লা);বুরোবাশ(দিনাজপুর, রংপুর); বালুকা (রাজশাহী) Bambusa balcooa Roxb. প্রধানতঃ বনাঞ্চল

 

খুঁটি, ঘরের সিলিং, সেতু, মই ও মাঁচান।

 

৯। বরিয়ালা

বাইজ্যা (চট্টগ্রাম); বাহিনী

বাশনী (টাংগাইল); জাই (সিলেট)

Bambusa vulgaris Schrad

 

প্রধানতঃ বনাঞ্চল খুঁটি, ঘরের সিলিং, সেতু, মই, মাচান, কাগজ ও মণ্ড।
১০। মিরতিংগা

মহাল (টাংগাইল, রাজশাহী, বনবাঁশ (কুমিল্লা); তলালা (দিনাজপুর, রংপুর)

Bambusa longispiculata Gam. প্রধানতঃ বনাঞ্চল খুঁটি, বেড়া, তরজা, অগভীর

নলকূপের পাইপ।

 

১১। ফারুয়া

বার্মা বাশ (হাজারীখিল, চট্টগ্রাম)

Bambusa polymorpha Munvo প্রধানতঃ বনাঞ্চল খুঁটি, বেড়া ও তরজা।
১২। কেটুয়া

কাটা, বিষকাটা (সিলেট, ময়মনসিংহ); বন বাঁশ (ঢাকা); কাটা (দিনাজপুর)

Bambusa bambos Voss

 

প্রধানতঃ বনাঞ্চল খুঁটি, মাচান ও সেতু।
১৩। বুদুম।

ভুদুম (চট্টগ্রাম, কক্সবাজার

ও পার্বত্য চট্টগ্রামের

বৌদ্ধমন্দিরে চাষ হয়ে থাকে।

Dendrocalamus gigantelts Munro প্রধানতঃ বনাঞ্চল মাছ ধরার জালের ভাসান নৌকার মাস্তুল, পাত্র বা ভাণ্ড

হিসাবে গাইট কাণ্ডের ব্যবহার।

 

১৪। লাঠি বাঁশ। Dendrocalamus strictus Nees. প্রধানতঃ বনাঞ্চল খুঁটি, মাচান, সেতু।
১৫। মিতিঙ্গা (মিরতিংগা) Bambusa burmanica Gamble সিলেট ও চট্টগ্রামের

বনাঞ্চল

খুঁটি, বেড়া ও তরজা।

 

১৬। বেথুয়া (জামাবেথুয়া, রন্ধুল, মুড়েল, সোনারতি)

 

Banmbusa cacharensis R.B. Mayumdar প্রধানতঃ বাংলাদেশের

গ্রামাঞ্চল বিশেষ করে বৃহত্তর সিলেট, কুমিল্লা,

নরসিংদি ও ময়মনসিংহ

খুঁটি, বেড়া ও তরজা।
১৭। কনক কাইচ (ডুলি বাঁশ,) Bambusa comillensis M.K. Alam কুমিল্লা, বি, বাড়িয়া ও

নোয়াখালী জেলার

বসতবাড়ীতে জন্মে।

খুঁটি, বেড়া ও তরজা।
১৮। টেংগিরা (তেঁতুইয়া

টেঙ্গল, কুনকুই ও ছোটমির্দিম)

 

Bambusa jaintiana R.B. Mayumder বৃহত্তর সিলেট বি. বাড়িয়া, ঢাকা,

গাজীপুর

খুঁটি, বেড়া ও তরজা।
১৯। ছুই Bambusa multiplex Raeuschel সমগ্র বাংলাদেশ। বাড়ীর সীমানা বেড়া ও

শোভাবর্ধনকারী হিসেবে।

লাগানো হয়।

২০। মাকলা (মহাল, কুস্তুর,

মল, মিতা, বাখল, বন)

 

Bambusa nutans Wall.

 

বন ও বসতবাড়ীতে

জন্মে।

খুঁটি, বেড়া ও চাটাই তৈরীতে ব্যবহৃত হয়।
২১। কালিজাওয়া (জাওথা,

কুরাজাভা, কাটাজালি, কাটাজালি)

 

Bambusa salarkhani M.K. Alam উপকূলীয় অঞ্চল ব্যতীত সমগ্র বাংলাদেশের। বাসতবাড়ীতে জন্মে। খুঁটি, বেড়া ও চাটাই তৈরীতে ব্যবহৃত হয়।
২২। ভুদুম বাঁশ Dendrocalamus asper Back & Heyne বাংলাদেশ বন-গবেষণা

ইনস্টিটিউট ও জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে

পরীক্ষামূলকভাবে চাষ শুরু হয়েছে।

মাছ ধরার জালের ভাসান,নৌকার। মাস্তুল, পত্র ও খুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

 

২৩। পাতলা বাঁশ Dendrocalamus membranaceus  Munro.

 

বাংলাদেশ বন গবেষণা  ইনস্টিটিউট ও জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে পরীক্ষামূলকভাবে চাষ শুরু হয়েছে। খুঁটি, তরজা ও বেড়া
২৪। টেন্ডুবাঁশ Gigantochloa apus Munro মিরপুর জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে চাষ করা হয়েছে। খুঁটি, তরজা ও বেড়া

 

২৫। কালাবাঁশ Gigantochloa atroviolacea Widjaja মিরপুর জাতীয় উদ্ভিদ  উদ্যানে চাষ করা হয়েছে। খুঁটি, তরজা ও বেড়া

 

২৬। বাৰ্মাবাঁশ (রেঙ্গনী বাঁশ) Thyrsostachys oliveri Gamble গ্রামাঞ্চলে চাষ হয়। খুঁটি, বেড়া ও মাচান
২৭। রেঙ্গনী বাঁশ Thyrsostachys regia Bennet বাংলাদেশ বন গবেষণা

ইনস্টিটিউটে পরীক্ষামূলকভাবে

চাষ করা হয়েছে।

খুঁটি তরজা ও বেড়া

 

 

বাঁশঝাড় সৃজন পদ্ধতি

বাঁশঝাড় সৃজন ২ প্রকার : ১। বীজের সাহায্যে ২। অংগজ পদ্ধতিতে

১। বীজের সাহায্যে : বাঁশ গাছে নিয়মিত ফুল হয় না। বাঁশঝাড়ের বয়স-জাত বিশেষ ২৫-৪০ বৎসর হওয়ার পর ফুল ধরে এবং তা থেকে বীজ ও চারা হয়। বরাক ও বারিয়ালা বাঁশে ফুল ফুটলেও তা থেকে বীজ হয় না। তাই বীজের চারা ব্যবহার করা হয় না। বানঞ্চলে মুলী বাঁশ বীজের সাহায্যেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে বংশ বিস্তার করে থাকে।

অংগজ বংশ বিস্তার : প্রাকৃতিক নিয়মে বাঁশের গোড় বো মোথা থেকে চারা বেরিয়ে বাঁশের ঝাড় সৃষ্টি হয়। অংগজ বংশ বিস্তার ২ প্রকার :

(ক) মোথা বা কন্দ পদ্ধতি।

(খ) প্রাক মূল কঞ্চি কলম বা কাটিং পদ্ধতি।

ক) মোথা বা কন্দ পদ্ধতি : এ পদ্ধতিতে মাটির নীচের বাঁশের গোড়াসহ কন্দ বা মোথা চারারূপে ব্যবহৃত হয় (চিত্র-৪০) বরাক, বারিয়ালা, মাকলা, জাই ইত্যাদি প্রজাতির বাঁশের বেলায় এ পদ্ধতি চালু আছে। এ পদ্ধতিতে বাঁশ ঝাড় হতে পুরাতন বাশ (৩-৪ বৎসর বয়সী) বাঁশ নির্বাচন করা হয়। বিশেষ করে মার্চ-এপ্রিল মাসে নির্বাচিত গাছটির গোড়া থেকে ৩-৪ উচ্চতায় কেটে ফেলতে হবে এবং মাটি থেকে মোথা উঠাতে হবে। তারপর মোথাটিকে পুকুরের পানির ধারে অথবা স্যাঁতস্যাঁতে জায়গায় মাটিতে পুঁতে রাখতে হবে। ঝড়ের জন্য নির্বাচিত স্থানে ২.৫ x ২.৫ x ২.৫ সাইজের গর্ত করতে হবে। এবং প্রতি গর্তের মধ্যে ৫ কেজি শুকনো গোবর, টি. এস. পি- ৫০ গ্রাম, ইউরিয়া ২৫ গ্রাম, মিউরেট অব পটাশ ২৫ গ্রাম চারা লাগানোর ১০-১২ দিন পূর্বে গর্তে মিশিয়ে রাখতে হবে। বিশেষ করে মে মাসে যখন নির্বাচিত মোথা হতে নতুন কুশি বের হবে তখন গর্তে লাগানো যায়। এতে ফলাফল ভাল পাওয়া যায়। বাঁশের মোথাসমূহ ১৬ x ১৬ দূরত্বের লাগানো যেতে পারে। এ পদ্ধতিতে ৪-৫ বছর এর মধ্যে পূর্ণাঙ্গ বাড়ে পরিণত হয়।

খ) প্রাকমূল কঞ্চি কলম পদ্ধতি : শিকড়সহ কঞ্চিকেই বলা হয় প্রাক-কঞ্চি কলম। এর আকার ছোট হয়। এ পদ্ধতির সুবিধা হলে প্রতিটি ঝাড় থেকে বহুগুণ চারা পাওয়া যায়। উৎপাদন খরচ কম ও পরিবহন সুবিধাজনক। নিম্নে বিস্তারিতভাবে পদ্ধতিটি আলোচনা করা হলো:

১) কঞ্চি কলম সংগ্রহকরণ : স্বাভাবিকভাবে বাঁশের মাথা ভেঙ্গে কিংবা কোড়ল বা কুল কেটে, যেভাবেই হোকনা কেন, কঞ্চিত শিকড় ও মোথার সৃষ্টি হয়ে যেসব কঞ্চি কলম সৃষ্টি হয়, সেগুলোকে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে সংগ্রহ করার ভাল সময়। কঞ্চিগুলোকে হাত-করাত দিয়ে কেটে শিকড়সহ বালতির পানিতে রাখা হয়। কঞ্চির আকার 2-3 লম্বা রাখা উচিত।

২) বেড তৈরী : বাড়তি অংশ ধারালো ছুরি বা কাঁচি দ্বারা কেটে দিতে হবে। যে কোন চাষযোগ্য জমি অথবা নার্সারীতে এজিং দিয়ে ৪৫ x ৪০ সাইজের প্রোপাগেশন বেড করতে হবে। বেডে ৩টি স্তর থাকবে।

উপরের স্তর : ৩ -৪ মিহি দানার বালি।

নীচের স্তর : ৩ -৪ মাঝারি দানার বালি।

নীচের স্তর : মাটা কাঁকড়া ও পাথর।

৩) প্রোপাগেশন বেড়ে কঞ্চিকলম রোপণ : বালতিতে করে নিয়ে আসা কঞ্চিকলমে ডালপালা ও পাতা ছাঁটাই করে ১.৫ x ১.৫ দূরত্বে ৩-৪ গভীর গর্ত করে শিকড়সহ কলম বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে লাগাতে হয়। বেডে নিয়মিত ৫/৬ বার পানি ও ছায়া দিতে হবে।

৪) পলিব্যাগে কঞ্চি কলম স্থানান্তরকরণ : বেডে লাগানোর মাসখানেকের মধ্যে প্রচুর শিকড় সৃষ্টি হবে। ১৫ x ৬ পলিথিন ব্যাগে ৩ ভাগ মাটি ও ১ ভাগ পচা গোবর দিয়ে মাটি ভর্তি করতে হবে। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে বেড থেকে কঞ্চি কলম শিকড়সহ তুলে পানিতে ধুয়ে পলিথিনের ব্যাগে স্থানান্তর করতে হবে। পলিথিন ব্যাগ বেডে সাজিয়ে নিয়মিত পানি ও ছায়া প্রদান করতে হবে ।

৫) মাঠে কঞ্চি কলম রোপণ : শ্রাবণ মাসের শেষে হার্ডেনিং করার জন্য কোড়লসমেত ব্যাগগুলো রৌদ্রে আনয়ন করতে হবে । কলম নূতন কোড়ল গজাতে দেখলে উহা মাঠে লাগানোর উপযুক্ত বলে গণ্য হবে। ভাদ্র মাসেই কঞ্চিকলমের চারা মাঠে লাগনোর উপযুক্ত হয়। ১৬ x ১৬ দূরত্বে গর্ত করে মোথা পদ্ধতির মতো সার-গোবর দিয়ে কঞ্চিকলমের চারা মাঠে লাগানো যেতে পারে, তাতে ভাল ফল পাওয়া যায়। বর্ষা দীর্ঘ না হলে পরবর্তী রোপণ মৌসুমে জ্যৈষ্ঠ আষাঢ় মাসে চারা রোপণ করা যায়। এ ব্যাপারে হাতেকলমে প্রশিক্ষণ গ্রহণ এবং আরও তথ্য জানতে হলে বন গবেষণাগার, ষোলশহর, চট্টগ্রাম-এর সাথে যোগাযোগ করতে হবে।

বাঁশ রোপণের স্থান নির্বাচন : সাধারণতঃ ডোবা, খাল, নালা ও পুকুরের পাড়ে এবং বাড়ীর আশেপাশের প্রান্তিক জমিতে বাঁশচাষ করা হয়। বাঁশে গুচ্ছমূল ও মোথা মাটি আটকিয়ে রেখে ভূমিক্ষয় রোধ করে। বাঁশ রোপণের স্থান নির্বাচনের সময় নিম্নলিখিত বিষয়ের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে:

১। কখনো ঘন ছায়া বা গাছের নীচে বাশ লাগানো যাবে না।

২। লবনাক্ত জমিতে বাঁশ লাগানো যাবে না।

৩। জমি একটু উঁচু হবে এবং কোন জলাবদ্ধতা থাকতে পারবে না।

৪। বসতবাড়ীর উত্তর পাশে বাঁশঝাড় হলে ভাল হয় এবং বায়ুরোধক হিসাবে কাজ করে।

৫। পাহাড়ী জমির নীচের ঢালে বাঁশ চাষ উত্তম।

কঞ্চি কলম বা চারা রোপণের নিয়মাবলী :

১। প্রায় দুই সপ্তাহ গর্তগুলোকে ঐভাবে রেখে দিয়ে, তারপর গর্তে অফসেট, কঞ্চি কলম বা চারা রোপণ করতে হয়।

২। কঞ্চিকলম ও চারা রোপণ হবে সোজাসুজি বা খাড়াভাবে, আর অফসেট লাগাতে হেবে একটু কাত করে, তাহলে গোড়ার দিকে তাড়াতাড়ি শিকড় বের হবে। রোপণ করে মটি চেপে দিতে হবে।

৩। বাঁশ লাগানোর পর খরা থাকলে, প্রতিটি চারা বা অফসেটের গোড়ায় সপ্তহের ২ দিন এক কলস করে পানি সেচ দেয়া দরকার।

৪। পাহাড়ী জমিতে বাঁশ লাগানোর পর গোড়াতে ঢালের নীচের দিকের মাটি কিছুটা উঁচু করে বাঁধের মতো করে দিতে হবে যাতে বৃষ্টির পানি ধরে রাখে।

বাশের যত্ন ও পরিচর্যা

১। সার ও মাটি প্রয়োগ : অন্যান্য গাছের মতো প্রতি বছর ফাল্গুন-চৈত্র মাসে ঝড়ের তলার মাটিতে নিম্নলিখিত সার প্রয়োগ করতে হবে । ঝাড়ের চারিদিকে মাটিতে ১-৬ চওড়া ও ২-3 গভীর নালা কেটে সার প্রয়োগ করে মাটি দ্বারা ঢেকে দিতে হবে। বৃষ্টি না হলে পানি দিতে হবে।

বাঁশের চারা লাগানোর প্রথম ও ৩ বছর বাঁশঝাড়ে মাটি প্রয়োগ করা নিপ্রয়োজন। ৪র্থ বছর থেকে প্রতি বছর কিছু আলগা মাটি দ্বারা সম্পূর্ণ ঝাড় ঢেকে দিতে হবে।

বাঁশ ঝাড়ে বছরভিত্তিক সার প্রয়োগ

 

সার সুপারিশকৃত সারের পরিমাণ (গ্রাম/গাছ/বছর)
১ম ২য় ৩য় ৪র্থ ৫ম ৬ষ্ঠ ৭ম ৮ম ৯ম ১০ম
গোবর ১০ ১০ ১৫ ২০ ২৫ ৩০ ৩৫ ৪০ ৪৫ ৫০
ইউরিয়া ২০০ ২০০ ৩০০ ৪০০ ৫০০ ৬০০ ৭০০ ৮০০ ৯০০ ১০০০
টিএপি ১০০ ১০০ ১৫০ ২০০ ২৫০ ৩০০ ৩৫০ ৪০০ ৪৫০ ৫০০
এমপি ৪০ ৪০ ৬০ ৮০ ১০০ ১২০ ১৪০ ১৬০ ১৮০ ২০০

 

২। মালচিং ও পানি সেচ : চারার গোড়ায় কচুরীপানা, খরকুটা কিংবা ছন দিয়ে ঢেকে দিলে ঝাড়ের মাটিতে শুষ্ক মৌসুমেও রস থাকবে এবং সেচের প্রয়োজন হবে না। চারা লাগানোর ১ম ও ২য় বছর পৌষ-চৈত্র মাস পর্যন্ত ১ সপ্তাহের পর প্রতিটি চারায় ১-২ কলস পানি প্রয়োগ করতে হবে । ২য় বছর পানির পরিমাণ বাড়াতে হবে।

৩। আগাছা পরিস্কার : চারা রোপণের ৩-৪ বছর পর্যন্ত ঝাড়ের আগাছা পরিস্কার রাখতে হবে।

৪। আংশিক ছায়া : চারাবাঁশ রোপণের পর প্রথম কয়েকবছর আংশিক ছায়া দিতে পারলে গাছের বৃদ্ধি দ্রুত হয়। এজন্য গাছের ফাঁকে ফাকে অড়হর ও মান্দার গাছ লাগাতে হয়।

৫। থিনিং : কঞ্চি বা বীজ জাত চারাবাঁশ রোপণের প্রথম ২/১ বছরে মধ্যে চিকন সরু বাঁশ গজায়। এসব বাঁশ কেটে নিলে মাটি থেকে নুতন কোড়ল বেরিয়ে আসবে। এর সাথে মরা বাঁশ ধারালো দা দ্বারা কেটে নিতে হবে। ৬। রোগবালাই দমন : রোগের মধ্যে বাঁশের ঝাড় মাথাপচা রোগ প্রধান। এ রোগে ঝাড়ের অধিকাংশ বাঁশের মাথা শুকিয়ে কিংবা পচে যায়। অনেক সময় সম্পূর্ণ ঝড় মাথাবিহীন হয়ে যায়। কাণ্ডের মরা অংশ ক্রমে বাদামী থেকে ফিকে লাল বর্ণের হয়ে পড়ে। এর দমনের জন্য ২টি ব্যবস্থা নেয়া যায়- মারা বাশ দেখা মাত্র তা ঝাড় থেকে অপসারণ করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। ঝাড়ে ছত্রাকনাশক ঔষধ ছিটাতে হবে। যেমন ডায়াথেন এম-৪৫, বোর্দোমিক্সার, কুপ্রাভিট ইত্যাদি।

বাড়ন্ত বাঁশের গোড়ায় উইপোকার আক্রমণ হলে দা দ্বারা কাচিয়ে ফেলতে হবে। উই দমনের জন্য হেপ্টাক্লোর, ক্লোর্ডেন, ডায়াডিন, থিওড়ান ইত্যাদি প্রয়োগ করতে হবে।

বাঁশ কাটার পদ্ধতি : গ্রামীণ বাঁশ কাটার জণ্য কোন পদ্ধতি আজও বের করা হয়নি। গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তিরাই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেন। তবে ডগাবাশ কাটা হয় না। সাধারণতঃ ৩ বৎসর বা তার উপরের বয়সের বাঁশ গ্রামে কাটা হয়। অবশ্য: এটাও অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে।

বনাঞ্চলের বাঁশ কাটার জন্য কিছু কিছু পদ্ধতি দেয়া আছে যা গ্রামের বাঁশের বেলায়ও প্রযোজ্য হতে পারে যেমন :

১। ৩ বৎসর বয়সের নীচে কোন বাঁশ কাটা যাবে না।

২। সব বাঁশকে এক ফুট রেখে কাটতে হবে।

৩। ঝাড়ে যতটি নতুন বাঁশ উঠবে ঐ পরিমাণ পুরাতন বাঁশ কাটা যাবে তার বেশী নয়। ঝাড়ের ভিতরের দিকে ১০টি বাঁশ থেকে ৩টি রেখে বাকী ৭টি পাকা বাঁশ কাটা যেতে পারে।

৪। কেবলমাত্র ঝাড়ের বাহির হতে কাটলে চলবে না, ঝাড়ের ভেতরেও কাটতে হবে ।

৫। বাঁশ হাত-করাত, ধারালো কুড়াল বা দা দিয়ে কাটা উচিত যাতে গোড়া থেতলিয়ে না যায়।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *